
টিআইবি: জলবায়ু অর্থায়নের ৮৯১টি প্রকল্পে ২ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি
জলবায়ু পরিবর্তন এখন বিশ্বের অন্যতম বড় সংকট। বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এ সংকট মোকাবিলায় জলবায়ু অর্থায়ন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। সংস্থাটির মতে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার নামে দেশে পরিচালিত ৮৯১টি প্রকল্পে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশের উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা এবং সরকারি তহবিল ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

দুর্নীতির ধরন ও প্রক্রিয়া: টিআইবির গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্নীতি ঘটেছে প্রকল্পের প্রায় প্রতিটি ধাপে—পরিকল্পনা প্রণয়ন, অনুমোদন, অর্থ ছাড়, ক্রয় ও বাস্তবায়ন পর্যন্ত। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা যাচাই না করেই রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও একই প্রকল্প বারবার নতুন নামে অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে ঠিকাদারদের যোগসাজশে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো, নিম্নমানের কাজ করা, কাগজে কলমে কাজ সম্পন্ন দেখানো, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্পের অস্তিত্বই না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া টিআইবি জানায়, জলবায়ু তহবিলের অর্থ বণ্টনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব প্রকট। দরপত্র প্রক্রিয়া অনেক সময় প্রতিযোগিতাহীন ছিল এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রাধিকার পেয়েছে। ফলে প্রকল্পের আসল উদ্দেশ্য—জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা ও জনগণের জীবনমান উন্নয়ন—বঞ্চিত হয়েছে।
পরিবেশ ও জনগণের ওপর প্রভাব: এই অনিয়ম ও দুর্নীতির ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপগুলো কার্যকর ফল দিচ্ছে না। উপকূলীয় অঞ্চল, হাওর-বাঁওড়, চরাঞ্চল এবং পাহাড়ি এলাকার মানুষ যেখানে জলবায়ুর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, সেখানে প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়ন না হওয়ায় তারা উপকার পাচ্ছেন না। অনেক স্থানে নদীভাঙন প্রতিরোধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, লবণাক্ততা কমানো, বা বিকল্প জীবিকা সৃষ্টির কাজ অসম্পূর্ণ থেকে গেছে।
ফলে জলবায়ু তহবিলের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হচ্ছে, এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। টিআইবি সতর্ক করেছে যে, এই ধরণের দুর্নীতি ও অপব্যবহার অব্যাহত থাকলে দেশের জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়বে।

Tax VAT Business Consultants ব্যক্তি ও কোম্পানি করদাতাদের আয়কর, ভ্যাট এবং ব্যবসায়িক বিষয়ক পরামর্শ, আয়কর রিটার্ন দাখিল ও প্রশিক্ষণ সেবা প্রদান করে।
টিআইবির সুপারিশ: টিআইবি সরকারের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরেছে। প্রথমত, জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিটি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন অডিট ও তদারকি ব্যবস্থা চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রকল্প অনুমোদন ও অর্থ বণ্টনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। তৃতীয়ত, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও সিভিল সোসাইটিকে প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সম্পৃক্ত করতে হবে, যাতে তারা সরাসরি তদারকি করতে পারে।
এ ছাড়া টিআইবি প্রস্তাব করেছে, জলবায়ু তহবিলের তথ্য ও ব্যয়ের বিস্তারিত নিয়মিতভাবে প্রকাশ করতে হবে এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশ বৈশ্বিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দাতা দেশগুলো এ খাতে বিপুল অর্থ সহায়তা প্রদান করছে। কিন্তু যদি এই অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার না হয়, তবে দেশের পরিবেশ ও জনগণের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়বে। টিআইবির এই প্রতিবেদন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জলবায়ু অর্থায়ন কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি নৈতিক ও নীতিগত দায়বদ্ধতার বিষয়ও। তাই এখনই সময়, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত জলবায়ু তহবিল ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা।
