বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন ভেঙে সাগরে মৃত্যু: দালালকে ২১ লাখ দিয়েও রক্ষা হলো না

বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন ভেঙে সাগরে মৃত্যু: দালালকে ২১ লাখ দিয়েও রক্ষা হলো না

‘ছেলেকে ইতালি পাঠাতে দালালকে ২১ লাখ টাকা দিয়েছিলাম। এত কিছু করার পরও ছেলেকে লাশ হয়ে ফিরতে হলো।’—লিবিয়ার আল–খুমস উপকূলে নৌকাডুবিতে নিহত এনামুল শেখের মৃত্যুতে এভাবেই আহাজারি করছিলেন তাঁর বাবা আকবর আলী শেখ। গতকাল বিকেলে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার ননিক্ষীর ইউনিয়নের পশ্চিম লওখন্ডা গ্রামে শোকের স্রোত নেমে আসে।

এনামুলের ভাই নিজামুল শেখ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আপনারা এতটুকু সহযোগিতা করুন যেন আমার ভাইকে দেশের মাটিতে এনে দাফন করতে পারি। অন্তত তার কবরে মাটি দিতে পারি।”

গত ১৩ নভেম্বর রাতে লিবিয়ার ভূমধ্যসাগর–সংলগ্ন আল-খুমস উপকূলে দুটি নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। এতে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার দুই যুবক—পশ্চিম লওখন্ডা গ্রামের আনিস শেখ (২৫) ও এনামুল শেখ (২৮)—নিহত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া খবর থেকে পরিবারগুলো তাঁদের মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারেন।

এ ঘটনায় মুকসুদপুর উপজেলার আরও ছয় যুবকের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে—ইব্রাহিম শেখ, আবুল শেখ, দুলাল মিনা, আশিক মিনা, সোহেল মোল্লা ও নিয়াজ মীনা।

পরিবারগুলোর ভাষ্য, ডুবে যাওয়া নৌকাগুলোর একটিতে ছিলেন ২৬ জন বাংলাদেশি। চারজনের মরদেহ উদ্ধার হওয়ার পর কয়েক দিন তথ্য সংগ্রহ করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এনামুল ও আনিসও মারা গেছেন।

বুধবার বিকেলে পশ্চিম লওখন্ডা গ্রামে দেখা যায়, এনামুলের বাড়িতে শোকাহত পরিবার–পরিজন ও প্রতিবেশীরা ভিড় করেছেন। স্বজনদের সান্ত্বনা দিতে গিয়ে অনেকেই নিজেও কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। চার ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিলেন এনামুল। পরিবারের আর্থিক অবস্থা বদলানোর স্বপ্নে বিদেশে পাড়ি জমাতে গিয়েই তাঁকে জীবন দিতে হলো।

আকবর আলী জানান, ১০ অক্টোবর বাংলাদেশ ছাড়েন এনামুল। ১৩ নভেম্বর রাতে আল-খুমস উপকূল থেকে নৌকায় যাত্রা করেন। কিছু দূর এগোতেই লিবিয়ার কোস্টগার্ড নৌকাটিকে ধাওয়া করে। পালানোর সময় নৌকাটি ডুবে যায়। এরপরই তাঁরা নিশ্চিত হন এনামুল আর বেঁচে নেই। আফসোস করে তিনি বলেন, ‘ইতালি পাঠানোর কথা বলে মাদারীপুরের এক দালালকে ২১ লাখ টাকা দিয়েছিলাম। এত টাকা দিয়েও শেষ পর্যন্ত আমার ছেলে লাশ হয়ে ফিরল।’

এনামুলের পাশের বাড়িই আনিস শেখের বাড়ি। সেখানে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। প্রতিবেশীরা জানান, শৈশবে মাকে হারান আনিস। বাবা ও দুই বোন নিয়ে তাঁর সংসার। বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে। পাঁচ বছর আগে আনিসও বিয়ে করেন। স্ত্রী ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মরত। দেড় বছরের একটি কন্যাসন্তানও আছে তাঁদের।

প্রতিবেশী জয়নাল শেখ বলেন, “মারা যাওয়ার পরই আমরা বুঝতে পারি অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার ঝুঁকি কত ভয়ংকর। ভালো থাকার আশায় আমরা সব হারিয়ে দিচ্ছি। এখন সন্তানের লাশ ফিরবে কি না, সেই দুশ্চিন্তায় পরিবারগুলো। অবৈধ পথে অভিবাসন বন্ধ করতে হলে দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা আর বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।”

ননিক্ষীর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আলমগীর মোল্যা বলেন, অবৈধ সমুদ্রপথ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বেকারত্ব আর জীবিকার সংকট অনেককে এসব পথে ঠেলে দিচ্ছে।

মুকসুদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা জানান, নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ চলছে। পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে উচ্চ কর্তৃপক্ষকে তথ্য পাঠানো হয়েছে।

CATEGORIES
TAGS
Share This