
ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড় — ১৯৭০ সালের ভোলার সেই ভয়াল ১২ নভেম্বর
আজ থেকে ঠিক ৫৫ বছর আগে, ১৯৭০ সালের এই দিনে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)-এর উপকূলীয় অঞ্চল আঘাত হানে ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড় — ভোলা ঘূর্ণিঝড়।
এই ভয়াবহ দুর্যোগে প্রাণ হারান প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষ, যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত।
ঘূর্ণিঝড়টি ছিল সিম্পসন স্কেলে তৃতীয় মাত্রার (Category 3), তবে এর ধ্বংসযজ্ঞ ছিল অকল্পনীয়। ঘণ্টায় প্রায় ১৮৫ কিলোমিটার বেগে বয়ে যাওয়া বাতাস এবং জলোচ্ছ্বাসে ২০ থেকে ৩০ ফুট পর্যন্ত উচ্চতার ঢেউ উপকূলীয় অঞ্চল প্লাবিত করে দেয়।
ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল, হাতিয়া, সন্দ্বীপসহ উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা মুহূর্তেই তছনছ হয়ে যায়। ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু—সবকিছু ভেসে যায় জলোচ্ছ্বাসে।
ঘূর্ণিঝড়ের পর তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক সরকার (প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান) দ্রুত ত্রাণ কার্যক্রমে ব্যর্থ হয়। বহু এলাকা দিন পেরিয়ে গেলেও কোনো সহায়তা পায়নি। পানযোগ্য পানি, খাবার ও আশ্রয়ের অভাবে হাজারো মানুষ ঘূর্ণিঝড়ের পরও প্রাণ হারায়।পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে না পারার জন্য পরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান নিজেই দুঃখ প্রকাশ করেন। তবে ততক্ষণে দুর্যোগ-পরবর্তী মানবিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করে।
ভোলা ঘূর্ণিঝড় কেবল একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় ছিল না — এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।সরকারের অদক্ষতা ও বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে।
২৪ নভেম্বর মওলানা ভাসানী এক সভায় ইয়াহিয়া খানের পদত্যাগ দাবি করেন এবং তৎকালীন শাসকদের ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা করেন।
এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন, যেখানে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘূর্ণিঝড়ের পর কেন্দ্রীয় সরকারের অবহেলাই জনগণের ক্ষোভকে স্বাধীনতার দাবিতে রূপান্তরিত করে।

ভোলা ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল এক শোকাবহ অধ্যায় নয়, বরং দুর্যোগ প্রস্তুতি ও সচেতনতার এক কঠিন শিক্ষা।
এই বিপর্যয়ের পর বাংলাদেশে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ ব্যাপকভাবে জোরদার হয়।
আজও অনেক সংগঠন ১২ নভেম্বরকে “উপকূল দিবস” হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানিয়ে আসছে, যেন এই দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—
প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ে টিকে থাকতে হলে প্রস্তুতি, সচেতনতা ও মানবিকতা—এই তিনের বিকল্প নেই।
